বৌচি খেলা ও ভিডিও সহ এর নিয়মকানুন [গ্রাম বাংলার খেলা]

গ্রাম বাংলায় এক সময়কার ব্যাপক জনপ্রিয় খেলা ছিল বৌচি বা বউচি। প্রযুক্তির উন্নতির আগে বৌচি খেলা ছেলে-মেয়েদের বিনোদনের বিরাট একটি অংশ ছিল। এখনো নোয়াখালীর মতো অনেক জেলায় এই খেলা প্রচলিত আছে। তবে দিনে দিনে এটি তার প্রাণ হারাচ্ছে।

বৌচি খেলা
বৌচি খেলা
ছবিঃ দৈনিক ইনকিলাব

এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি যাতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে না যায় সেজন্য আমাদের এই ক্ষুদ্র চেষ্টা। আমরা সবার সামনে খেলাটিকে আবার তুলে ধরছি। বৌচি খেলার নিয়মকানুন গুলোও আমরা আপনাদের জানিয়ে দিব। যারা এই খেলাটি জানেন না তারাও খুব সহজেই বৌচি খেলা খেলতে পারবেন।

বৌচি খেলা খেলতে কতটুকু জায়গা লাগে?

এই খেলাটি খেলতে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয়না। ঘরের সামনে উঠানের মতো ছোটখাটো জায়গায় এই চমৎকার খেলাটি খেলা যায়।

আর ধান কাটার পর জমি অনেকদিন খালি থাকে। তখন সেখানেও বৌচি খেলা যায়। অর্থাৎ বড় মাঠে যেমন বৌচি খেলা যায় তেমনি ছোট খালি জায়গায়ও অনায়াসেই খেলাটি খেলা যায়।

বৌচি খেলা কিভাবে খেলে?

বৌচি খেলায় ৫-১০ এর মতো খেলোয়াড় এক দলে খেলতে পারে। এই খেলায় খেলোয়াড়ের সংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট হিসেব নেই। ক্ষেত্র বিশেষে খেলোয়াড়ের সংখ্যা কম বেশি হয়।

বৌচি খেলায় মাঠের এক পাশে আয়তকার একটি ঘর থাকে। অপর পাশে বৃত্তাকার আরেকটি ঘর থাকে। আয়তকার ঘর থেকে বৃত্তাকার ঘরের দূরত্ব আনুমানিক ১০-২০ ফুট হয়।

যেই দল টসে জিতে সেই দলের একজন বৃত্তাকার ঘরে গিয়ে দাঁড়ায়। যে বৃত্তাকার ঘরে দাঁড়ায় সেই মূলত “বৌ”। কোনো কোনো স্থানে বৌকে বুড়িও বলা হয়। দলের অপর সদস্যরা আয়তকার ঘরে অবস্থান করে।

বিপক্ষ দলের সকল সদস্যা বৃত্তাকার ও আয়তকার ঘরের আশেপাশে অবস্থান করে। তাদের কাজ হচ্ছে “বৌ” কে পাহারা দেওয়া।

আয়তকার ঘর থেকে কেউ একজন “চি” দেয়। অর্থাৎ দম নিয়ে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের তাড়া করে। সে বিপক্ষ দলের কাউকে স্পর্শ করলে সে খেলোয়াড় মারা পড়ে বা আউট হয়ে যায়। দম শেষ হওয়ার আগেই তাকে আয়তকার ঘরে ফিরে আসতে হয়। অন্যথায় সে দম হারালে বিপক্ষ দল তাকে ঘরে ফিরার আগে স্পর্শ করলে বা ধরে ফেললে সেই খেলোয়াড়টিও আউট হয়ে যায়।

গ্রাম বাংলার বউচি খেলা | বৌচি খেলা
গ্রাম বাংলার বউচি খেলা

খেলোয়াড়ের দম দেওয়া অবস্থায় বৌ বৃত্তাকার ঘর থেকে দৌড়ে আয়তকার ঘরে আসতে পারলে বৌ এর দল জিতে যায়। এই বৃত্তাকার ঘর থেকে এক বার বের হয়ে গেলে আয়তকার ঘরে পৌঁছানোর আগে বিপক্ষ দলের কেউ তাকে ছুঁয়ে দিলে বা স্পর্শ করতে বৌ এর দল আউট হয়ে যায়।

অর্থাৎ বৌয়ের দলের একজন দম নিয়ে সবাইকে আউট করার উদ্যেশ্যে তাড়া করে। আর এই সুযোগে বৌ এক ঘর থেকে অন্য ঘরে দৌড়ে আসার চেষ্টা করে। আয়তকার ঘরে আসতে পারলে বৌয়ের দলের এক গেম হয় অর্থাৎ ১ ম্যাচ জিতা হয়। আর বিপক্ষ দলের কেউ ধরে ফেললে সম্পূর্ণ দল আউট হয়ে যায়।

বৌ আউট হলেই পুরো দল আউট হবে। যে দম করবে সে আউট হলে পুরো দল আউট হবেনা। শুধুমাত্র সেই আউট হবে। এক দল আউট হলে বিপক্ষ দল একইভাবে বৌ হিসেবে একজন দাঁড়াবে ও বাকিরা একজন একজন করে পালাক্রমে দম করে অন্য দলের খেলোয়াড়দের তাড়া করবে।

কয়টি দম বা চি দেওয়া যায়?

বৌ ছাড়া ১ দলে যতজন খেলোয়াড় থাকে প্রত্যেকেই একটি করে চি দেওয়ার সুযোগ পায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২ দল মিলে চি এর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে নেয়। সেক্ষেত্রে ৩-৮ টি চি হয়ে থাকে। তবে সাধারণত, বৌ বাদে বাকিরা একটি করে চি বা দম করে অন্যদের তাড়া করতে পারে।

দম নেওয়ার সময় “বৌচি”, ” কুতকুত কুতকুত” “ছিইইইইইইইইইইইইই”, “কুত্তার লাডি গরম হানি” ,”ডগ স্টিক হট ওয়াটার”, “ছুতিরে চুইচ না,খেলা তুই ভাংগিচ না”, “ছি কুত কুত তারে নারে,বউ তুই চলি আয়রে”, “ইরে তুই হরি জা, বউ গারে দি জা”, “ছি কুত কুত হানাইয়া, নৌকা দিলাম বানাইয়া”, ” ছি গো ছি কইরলাম কি, কামরাঙা তুলোসি” ইত্যাদি ছড়া কাটা হয়।

বিঃদ্রঃ চি দেওয়ার সময় বিভিন্ন ছড়া বলা হয়ে থাকে। অঞ্চলভেদে এটি ‘বুড়ি কপাটি’, ‘বৌ-বসান্তি’, ‘বুড়ির চু’ ইত্যাদি নামে পরিচিত।

বৌচি খেলার ভিডিও

কারা বিজয়ী হয়?

পালাক্রমে কয়েক ম্যাচ খেলার পর দিন শেষে যাদের বৌ নিরাপদে বিপক্ষ দলের স্পর্শ ছাড়া বেশি সংখ্যকবার আয়তকার ঘরে ঢুকতে পারে তারাই বিজয়ী হয়।

এই খেলার মূল লক্ষ কি?

বিপক্ষ দলকে পরাজিত করে বা তাদের আক্রমণকে প্রতিহত করে বৌ কে আনাই এই খেলার লক্ষ বা তার্গেট। হয়তো চি দিয়ে বৌকে ঘরে আনা হয় বলেই এই খেলার নাম “বৌচি”।

Leave a Comment